ডেটা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
Published : ১৬:৩৬, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
বিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ তথ্যের ভেতরেই বাস করছে। চারপাশের পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, সংখ্যা, চিহ্ন- সবকিছুই একেক ধরনের তথ্য। ‘ডাটা’ শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন ‘ডেটাম’ থেকে, যার অর্থ ‘প্রদত্ত জিনিস’। যদিও শব্দটি এসেছে অনেক পরে, তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের চর্চা মানবসভ্যতার একেবারে আদিযুগ থেকেই শুরু।

প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার বছর আগে প্যালিওলিথিক যুগের মানুষ গণনার প্রয়োজনে ব্যবহার করত ইশাঙ্গো বা বাবুনের হাড়। তখনও কাগজ, কলম কিংবা ক্যালকুলেটরের অস্তিত্ব ছিল না। এই হাড়ে খোদাই করা দাগগুলোই তথ্য সংরক্ষণের প্রথম নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বেছে নেয় চিত্রকলাকে। প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে গুহার দেয়ালে আঁকা হরিণ, ঘোড়া, মানুষ ও নানা বিমূর্ত চিহ্নের মাধ্যমে তারা শিকার কৌশল, সামাজিক আচরণ, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করত। বলা যায়, ভাষার সূচনাও হয়েছিল দৃশ্যমান চিত্রের হাত ধরেই।
এই ধারাবাহিকতার পর ইতিহাসের প্রথম লিখিত ভাষা কিউনিফর্মের উদ্ভব ঘটে সুমেরীয় সভ্যতায়। পরে ব্যাবিলনীয়রা জনসংখ্যা, সামাজিক শ্রেণি, গবাদিপশু, খাদ্য ও দুধের হিসাব রাখতে শুরু করে। নিয়মিত জনসংখ্যা গণনার মাধ্যমে আদমশুমারির ধারণা গড়ে ওঠে। তারা প্রতি পাঁচ বা সাত বছর অন্তর এই গণনা করত এবং গুণ, বর্গ, ঘনকসহ বিভিন্ন গাণিতিক সারণি প্রবর্তনের মাধ্যমে তথ্যকে অর্থবহ রূপ দিতে সক্ষম হয়।
সংখ্যার ব্যবহার কেবল হিসাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সঙ্গীত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ দেখা যায়। সমসাময়িক সময়ে চীনা গণিতবিদরা গণনা বোর্ডে ছোট কাঠি ব্যবহার করে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের কাজ করতেন। কাঠি বসানো ও সরানোর মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো জটিল গাণিতিক হিসাব।
১৮ শতকে এসে যুক্তিবিদ্যার জগতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন ব্রিটিশ গণিতবিদ জর্জ বুল। তিনি মানুষের যুক্তিকে গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীতে বুলীয় যুক্তি নামে পরিচিত হয়। এই ধারণাই আধুনিক যুক্তিবিদ্যা ও ডিজিটাল সার্কিটের ভিত্তি গড়ে দেয়। ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্নায়ুবিজ্ঞানী ওয়ারেন ম্যাককালোচ এবং যুক্তিবিদ ওয়াল্টার পিটস মানব মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালিকে যুক্তির কাঠামোয় ব্যাখ্যা করেন। তারা দেখান, কীভাবে ওজনযুক্ত সংকেতের মাধ্যমে নিউরনের মতো কাঠামো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। এখান থেকেই কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণা গড়ে ওঠে।
১৯ শতকের পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং প্রশ্ন তোলেন- যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি প্রস্তাব করেন টুরিং পরীক্ষা, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে ওঠে। কয়েক বছর পর জন ম্যাকার্থি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শব্দটির প্রবর্তন করেন। লক্ষ্য ছিল যন্ত্রের মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধিমত্তার অনুকরণ। তবে পর্যাপ্ত তথ্য ও গণনাশক্তির অভাবে সত্তরের দশকে এই গবেষণার গতি কিছুটা থমকে যায়।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে মেশিন ডাটা থেকে শিখতে শুরু করে এবং প্যাটার্ন বুঝতে সক্ষম হয়। একই সময়ে ডাটার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তার ফলে বিপুল পরিমাণ ডাটা তৈরি হতে থাকে, যা ‘বিগ ডাটা’-র জন্ম দেয়। এই ডাটার সহজলভ্যতা এবং কম্পিউটারের ক্রমবর্ধমান কম্পিউটিং ক্ষমতা এআই-এর পারফরম্যান্স উন্নত করতে সহায়ক হয়। এরপর আধুনিক এআই আমাদের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
বর্তমানে আমরা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের যুগে প্রবেশ করেছি, যার সূচনা হয়েছিল “Attention Is All You Need” শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে প্রকাশিত ট্রান্সফরমার ধারণার মাধ্যমে।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত “এআই চ্যাটবট” ও “এআই এজেন্ট”-এর পেছনের মূল প্রযুক্তি হলো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। এই মডেলগুলোকে বিপুল পরিমাণ টেক্সট ডেটার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যার ফলে এগুলো মানুষের মতো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারকারীর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়।
লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল নিঃসন্দেহে আমাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, তবে একই সঙ্গে অনেক এন্ট্রি-লেভেলের চাকরি প্রতিস্থাপনও করেছে। গত কয়েক বছরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি ছিল- “এআই কি আমাদের প্রতিস্থাপন করবে?” মানুষ যদি নিজেকে দক্ষ করে তোলে এবং এআই ব্যবহারে পারদর্শী হয়, তবে তাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক এন্ট্রি-লেভেলের কাজ ইতোমধ্যেই এআই দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাথিউ রেইনি তার ১৬ বছর বয়সী সন্তান অ্যাডামের আত্মহত্যার জন্য চ্যাটজিপিটিকে দায়ী করেন। সন্তানের মৃত্যুর পর তারা চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কিশোরটির দীর্ঘ কথোপকথন খুঁজে পান। তাদের অভিযোগ, এই ধরনের সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শিশুদের যেকোনও মূল্যে অনলাইনে ধরে রাখা যায় এবং তাদের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। এই ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
চ্যাটবটের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আধুনিক সমাজের জন্য আশীর্বাদ হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত এআই ব্যবহারে যেন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সম্ভাবনা নষ্ট না হয়, সেদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ব্যবহারিক ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে আমাদের কগনিটিভ অ্যাবিলিটি কমে না যায়। পাশাপাশি, এআই এথিকস ও এআই গভর্ন্যান্সের বিষয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: লিড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও উন্নয়ন, সীথ্রিবীট
এমএএইচ

















