বুধবার; ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; ২১ মাঘ ১৪৩২

ফাইবার ব্যাংক কেন সময়ের দাবি ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ফাইবার ব্যাংক কেন সময়ের দাবি

-হিটলার এ. হালিম

Published : ১৪:৪৩, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত ভিত্তি হলো অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক। অথচ বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো- হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের একটি বড় অংশ আজও অব্যবহৃত, পড়ে আছে। এই অপচয় বন্ধ করতে এবং বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে যে ধারণাটি সামনে এসেছে, তা হলো ফাইবার ব্যাংক। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী মডেল।

ফাইবার ব্যাংক মূলত একটি সফট কনসোর্টিয়ামভিত্তিক কাঠামো, যেখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অধীনে থাকা অব্যবহৃত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক একত্রিত করে প্রয়োজনে স্থান ও দূরত্বের ভিত্তিতে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। এখানে নতুন করে ফাইবার বসানোই মুখ্য নয়; বরং আগে থেকে থাকা অতিরিক্ত ফাইবারকে ব্যালেন্স হিসেবে মজুদ রেখে প্রয়োজনের সময় তা কাজে লাগানোই মূল দর্শন। ঠিক যেমন ব্যাংকে টাকা জমা থাকে এবং প্রয়োজন হলে উত্তোলন করা যায়, তেমনি ফাইবার ব্যাংকে ফাইবার সংরক্ষিত থাকবে এবং চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করা যাবে।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ব্যয় সাশ্রয় ও সময় সাশ্রয়। দেশে বারবার রাস্তা কেটে নতুন ক্যাবল বসানোর প্রয়োজন কমবে। এতে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে, তেমনি নাগরিক ভোগান্তিও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক দ্রুত বিস্তৃত হবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। ডিজিটাল সেবা, ই-গভর্ন্যান্স, টেলিমেডিসিন ও অনলাইন শিক্ষার মতো উদ্যোগগুলো বাস্তব রূপ পাবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফাইবার ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। বর্তমানে অন্তত চারটি সরকারি সংস্থার অধীনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার বড় অংশ কার্যত অব্যবহৃত। বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্ষেত্রে রেল ট্র্যাকের বাইরে ফাইবার ব্যবহারে দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ থাকায় তাদের নেটওয়ার্ক প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে যুক্ত ফাইবার ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার কারণে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ফাইবারও বেশিরভাগ সময় অলস পড়ে থাকে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বহু কোরবিশিষ্ট ফাইবারের মাত্র অল্প কয়েকটি কোর ব্যবহার হচ্ছে, বাকিগুলো অব্যবহৃত। একইভাবে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানির (বিটিসিএল) ন্যাশনওয়াইড ফাইবার নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ এখনও সক্রিয় ব্যবহারের বাইরে।

এই অব্যবহৃত ফাইবার শুধু অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণভাবে অপটিক্যাল ফাইবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সক্রিয় না হলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ, আজ যে সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে আছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা কার্যত মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

ফাইবার ব্যাংক কোনো বিলাসী প্রকল্প নয়; এটি সময়ের দাবি। নতুন করে টাকা-কড়ি ঢালার চেয়ে আগে থেকে থাকা সম্পদকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত পথ। সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলে ফাইবার ব্যাংক বাংলাদেশকে সত্যিকারের ডিজিটাল রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে এক শক্ত ভিত তৈরি করতে পারে।

ফাইবার ব্যাংকের কার্যপ্রণালী এখানে একটি যুগান্তকারী সমাধান দিতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অব্যবহৃত ফাইবার নেটওয়ার্কগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা হবে। আধুনিক সফটওয়্যার ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রাহকের অবস্থান অনুযায়ী নিকটতম ফাইবার শনাক্ত করা হবে এবং দ্রুত সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। রেলওয়ে, বিদ্যুৎ গ্রিড, কম্পিউটার কাউন্সিল ও টেলিযোগাযোগ কোম্পানির ফাইবার এই কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ব্যবহৃত হবে। ভাড়াভিত্তিক ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায্য রাজস্ব পাবে, আবার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ভাগাভাগি হবে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই এই উদ্যোগের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭৮ হাজার ৪০০ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার প্রায় ৪০ শতাংশ অব্যবহৃত। টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানির প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটার ফাইবারের বড় অংশ ভূগর্ভস্থ। কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যে হাজারো ইউনিয়নে পৌঁছেছে, তবে এখনও অনেক অংশ সম্প্রসারণাধীন। বিদ্যুৎ গ্রিড ও রেলওয়ের ফাইবার নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। এই অব্যবহৃত সম্পদগুলো একত্রে কাজে লাগানো গেলে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছানো কোনও কষ্টকল্পনার বিষয় থাকবে না।

বর্তমান বাস্তবতায় দেশের অধিকাংশ মোবাইল টাওয়ার এখনও ফাইবার সংযোগের বাইরে এবং প্রায় সব ঘরবাড়িই সরাসরি ফাইবার সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফাইবার ব্যাংক এই চিত্র বদলে দিতে পারে। সব টাওয়ার ফাইবার সংযোগে এলে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান ও গতি বহুগুণে বাড়বে। কম খরচে নতুন প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি বিস্তার সম্ভব হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গিগাবিটস গতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফাইবার ব্যাংক একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। ধারণা করা হচ্ছে, অব্যবহৃত ফাইবার ভাড়ার মাধ্যমে বছরে কয়েক শত কোটি টাকার রাজস্ব আয় সম্ভব। যৌথ রক্ষণাবেক্ষণের ফলে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। বেসরকারি অপারেটরদের ব্যান্ডউইথ খরচ কমে আসবে, যার সুফল শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকই পাবে। ইন্টারনেট সেবার দাম কমবে, মান বাড়বে।

সব মিলিয়ে ফাইবার ব্যাংক কোনো বিলাসী প্রকল্প নয়; এটি সময়ের দাবি। নতুন করে টাকা-কড়ি ঢালার চেয়ে আগে থেকে থাকা সম্পদকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত পথ। সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলে ফাইবার ব্যাংক বাংলাদেশকে সত্যিকারের ডিজিটাল রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে এক শক্ত ভিত তৈরি করতে পারে।

যেসব দেশে কার্যকরভাবে ফাইবারভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, সেখানে প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান সুফল হলো দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো আরও গতিশীল ও দক্ষ হয়েছে।

অন্যরা কী ভাবছে, কী করছে

ডিজিটাল রাষ্ট্র গঠনের পথে অনেক দেশই এখন যোগাযোগ অবকাঠামোর মূল ভরকেন্দ্র হিসেবে ফাইবারভিত্তিক নেটওয়ার্ককে বেছে নিচ্ছে। এটি কেবল দ্রুতগতির ইন্টারনেটের প্রশ্ন নয়; বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় সেবার রূপান্তরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি কাঠামোগত সিদ্ধান্ত।

মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে সরকার মালিকানাধীন একটি জাতীয় ফাইবার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যার লক্ষ্য দেশজুড়ে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সুবিধা নিশ্চিত করা। এই অবকাঠামো বেসরকারি সেবাদানকারীদের জন্য উন্মুক্ত রেখে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।

ভারতের কেরালা রাজ্যে সরকার পরিচালিত ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই দেশের গোয়া রাজ্যেও সরকারি দপ্তর, শিক্ষা ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে আলাদা ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে।

ইউরোপের এস্তোনিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে শহর ও গ্রামজুড়ে ফাইবার অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, যা দেশটির ডিজিটাল অগ্রগতির একটি বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও স্পেনের মতো বহু উন্নত দেশ ফাইবারভিত্তিক সংযোগকে তাদের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।

এসব দেশ কী সুফল পাচ্ছে

যেসব দেশে কার্যকরভাবে ফাইবারভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, সেখানে প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান সুফল হলো দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো আরও গতিশীল ও দক্ষ হয়েছে।

আরেকটি বড় অর্জন হলো ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি। গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ অনলাইনে পড়াশোনা, দূরবর্তী চিকিৎসাসেবা এবং কর্মসংস্থানের তথ্য সহজে পাচ্ছে। সরকারনেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে এই সুফল আরও স্পষ্ট। ফাইবার অবকাঠামো যদি উন্মুক্ত ব্যবহারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে সেবাদানকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে। এর ফলে সেবার মান উন্নত হয় এবং গ্রাহকের জন্য খরচ কমে আসে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে।

নিউজিল্যান্ড সরকার দেশটির অধিকাংশ জনগণকে ঘরে ঘরে ফাইবার সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি বিশ্বের বহু উন্নত দেশ ফাইবার সংযোগের বিস্তার বাড়ানোর পরিকল্পনায় এগোচ্ছে, যাতে সব খাতে উচ্চমানের ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা যায়।

উন্নয়নশীল অনেক দেশও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল অবকাঠামো বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। তাদের লক্ষ্য একটাই- ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম করা।

ফাইবার নেটওয়ার্ক তাই কেবল ক্যাবল বা প্রযুক্তি নয়; এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার প্রতিচ্ছবিও।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম (বিআইজেএফ)

এমএএইচ

শেয়ার করুনঃ