সেমিকন্ডাক্টর গবেষণায় নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ, সোমবার উদ্বোধন
Published : ১৭:০৫, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
জীবপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকস বিষয়ক বিয়ার সামিটে সৃষ্ট জাতীয় ঐক্য ও গতিকে ভিত্তি করে জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই ধারাবাহিকতায় আগামীকাল (২৯ ডিসেম্বর) উদ্বোধন হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে গবেষণা উৎকর্ষ কেন্দ্র (সেন্টার অব রিসার্চ এক্সিলেন্স ইন সেমিকন্ডাক্টর টেকনোলজি- ক্রেস্ট) যা দেশের ডিপ-টেক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই উদ্বোধনী পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
বিয়ার সামিট বাংলাদেশের ডিপ-টেক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় তৈরি করে। এই সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, একাডেমিক গবেষক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং তরুণ প্রজন্ম একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে একত্রিত হন। সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই বাস্তব রূপ দিতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করছে এই গবেষণা কেন্দ্র, যা ‘সিলিকন রিভার’ নামের বৃহত্তর জাতীয় ইকোসিস্টেম কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে।
সিলিকন রিভার একটি সমন্বিত জাতীয় ধারণা, যেখানে প্রতিভা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা অবকাঠামো, শিল্পখাতের অংশগ্রহণ, বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব এবং নীতিনির্ধারণকে একটি কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থার একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গড়ে উঠছে নতুন গবেষণা কেন্দ্রটি, যেখানে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং শিল্পঘনিষ্ঠ উদ্ভাবন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হবে।
গবেষণা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায়। এটি দেশের শিল্পখাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেখানে স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করছে।
সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি আধুনিক বিশ্বের মূলভিত্তি। ইলেকট্রনিক যন্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি ব্যবস্থা এবং উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা— সবকিছুই এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা কেন্দ্র ও সিলিকন রিভার কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের যুগ পেরিয়ে শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পখাত, প্রবাসী বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারণকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত জাতীয় পথচলায় প্রবেশ করছে, যার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বিয়ার সামিটে।
প্রাথমিক পর্যায়ে এই গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদান করবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উন্নত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং বাস্তব সেমিকন্ডাক্টর সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়টি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য অংশীদার প্রতিষ্ঠান। এসব কেন্দ্রে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও কাঠামোবদ্ধ দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
এদিকে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির নেতৃত্বে গড়ে উঠছে বাংলাদেশের অনলাইন সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, যা বিয়ার সামিটে কল্পিত একটি জাতীয় ভার্চুয়াল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ এবং দেশি-বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে শিক্ষা, মেন্টরশিপ, যৌথ প্রকল্প ও সুযোগ বিনিময় করতে পারবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের অগ্রগতিও তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মালয়েশিয়া রোডশোর কথা উল্লেখ করা হবে, যা আঞ্চলিক সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও জোরদার করেছে।
একই সঙ্গে ব্রেইনগেইন উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকার কথাও আলোচনায় আসবে। তারা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা, দিকনির্দেশনা এবং প্রাথমিক শিল্পকাজ দেশে নিয়ে আসছেন, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যদিও ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা ও নীতিগত অস্পষ্টতাসহ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে, তবুও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে জাতীয় দিকনির্দেশনা, সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখন একত্রিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যেখানে বিয়ার সামিটের শক্তিকে ভিত্তি করে সিলিকন রিভার ও নতুন গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর অভিযাত্রার পরবর্তী অধ্যায় তুলে ধরা হবে।
এমএএইচ















