কনটেন্ট দেখতে দেখতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রঞ্জু মিয়া
Published : ১৭:৩২, ১৭ জুন ২০২৬
গাইবান্ধা সদরের রঞ্জু মিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সংসারের প্রয়োজনে পড়াশোনায় বিরতি দিতে হয় তাঁকে। এরপর জীবিকার তাগিদে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন কাজে। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও শিক্ষাজীবনে ফেরেন। ২০২৩ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি।
তবে রঞ্জু মিয়ার পরিচিতি এসেছে অন্য এক কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে দেশের জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেতের কথা বলার ভঙ্গি অনুকরণ করে তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। ছন্দ মিলিয়ে কথা বলা তাঁর ভিডিওর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রঞ্জু মিয়ার ফেসবুক পেজ লিংক- https://www.facebook.com/livetvdariapur
রঞ্জু মিয়া বলেন, “শুরুতে শখের বশে ভিডিও বানাতাম। পরে দেখি মানুষ পছন্দ করছে। তখন নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি শুরু করি।”
একসময় ফেসবুক থেকে তাঁর আয়ও ছিল উল্লেখযোগ্য। রঞ্জু জানান, দুই বছর আগে ফেসবুক থেকে তাঁর মাসিক আয় অনেক বেশি ছিল। কোনও কোনও মাসে তিনি সর্বোচ্চ সাড়ে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। সর্বনিম্ন আয়ও ছিল দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। বর্তমানে ফেসবুক থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, “এখন মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করাটাও অনেক কঠিন হয়ে গেছে। দুই বছর আগে যে আয় হতো, এখন তার সঙ্গে তুলনাই চলে না।”
হানিফ সংকেতের কণ্ঠভঙ্গি অনুসরণ করেই তাঁর জনপ্রিয়তার শুরু। এ বিষয়ে রঞ্জু বলেন, “হানিফ সংকেত স্যারের কথা বলার ধরন আমার খুব ভালো লাগত। সেটা অনুসরণ করেই ভিডিও বানানো শুরু করি। মানুষ সেটি গ্রহণ করেছে।”
তিনি জানান, এরই মধ্যে হানিফ সংকেতের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। শিগগিরই দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রঞ্জুর দাবি, “হানিফ সংকেত সাহেব অনেককে কপিরাইট দিয়েছেন, কিন্তু আমাকে দেননি।”

ভিডিওতে ছন্দ মিলিয়ে কথা বললেও ছন্দের আনুষ্ঠানিক নিয়ম সম্পর্কে তার ধারণা সীমিত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রঞ্জু হাসতে হাসতে বলেন, “ছন্দের যে নিয়মকানুন আছে, তা আমার জানা নেই। আমি কখনও শিখিওনি। তবে কিছুটা বুঝতে পারি কীভাবে কথা বললে ভালো শোনায়। সেভাবেই বলি। মানুষ পছন্দ করে, এটাই বড় কথা।”
গ্রামের সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা রঞ্জু মিয়ার গল্পটি বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট জগতের এক ভিন্ন বাস্তবতাও তুলে ধরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও সেই আয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তবু দর্শকদের ভালোবাসা আর নিজের স্বতন্ত্র উপস্থাপনা ভঙ্গির ওপর ভর করে সামনে এগিয়ে যেতে চান গাইবান্ধার এই কনটেন্ট নির্মাতা। রঞ্জু মিয়ার ইউটিউব চ্যানেলের
লিংক- https://www.youtube.com/@ranjumiamusic
রঞ্জু মিয়ার পরিবারের আর্থিক অবস্থা একসময় এতটাই নাজুক ছিল যে একটি স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্যও তাঁদের ছিল না। জীর্ণশীর্ণ ঘরে বসবাস করা পরিবারটির ছোট সন্তান রঞ্জুর মনে যখন কনটেন্ট নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন জাগে, তখন তাঁর নিজের কোনও স্মার্টফোনই ছিল না।
সেই স্বপ্নের প্রথম সঙ্গী হয়ে আসে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উপহার দেওয়া একটি স্মার্টফোন। ওই ফোন দিয়েই ভিডিও তৈরি শুরু করেন রঞ্জু। পরে তার কাজ দেখে উৎসাহিত হন স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকার মানুষ। তাদের আর্থিক সহায়তায় কিনতে সক্ষম হন দ্বিতীয় স্মার্টফোনটি। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে তার জীবনের গল্প।
ফেসবুকে জনপ্রিয়তা ও আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের অবস্থারও পরিবর্তন আসে। একসময় যে পরিবার জীর্ণ ঘরে বসবাস করত, সেই বাড়িতেই এখন উঠেছে পাকা ঘর। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর আয়ের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যবসায়ও বিনিয়োগ করেছেন তিনি। পরিবারের ছোট সন্তান রঞ্জু মিয়া স্থানীয় বাজারে একটি কাপড়ের দোকান গড়ে তুলেছেন। তার ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে পরিচিতি ও আয়ের সুযোগ করে দিলেও স্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়তে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
একসময় যে তরুণের হাতে স্মার্টফোন ছিল না, আজ সেই রঞ্জু মিয়া ডিজিটাল মাধ্যমের সাফল্যকে পুঁজি করে নিজের পরিবার ও ভবিষ্যতের জন্য নতুন ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করছেন।
রঞ্জু মিয়ার রয়েছে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। সেই চ্যানেলে তিনি তার নিজের গাওয়া গান, মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করেন। বিভিন্ন মুখী কাজ করে তিনি ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের ফুটপ্রিন্ট রেখে যেতে চান।
এমএএইচ















