বাজেটে সিম ট্যাক্স বাতিল, ল্যাপটপ-কম্পিউটারের দামও কমবে
Published : ১৮:২১, ১১ জুন ২০২৬
তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে দেশের অন্যতম প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একগুচ্ছ কর ও ভ্যাট ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ ও কম্পিউটার আমদানিতে প্রায় সব ধরনের শুল্ক-কর প্রত্যাহার, নতুন সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর বাতিল, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণে বিশেষ সুবিধাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় এসব কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমাবে, ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়াবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
বাজেট প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম তথ্যপ্রযুক্তি খাত (হার্ডওয়্যার পণ্য) নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
কমবে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের দাম
বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার এবং মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট প্রত্যাহার।
এ ছাড়া এসএসডি আমদানির ক্ষেত্রেও ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছাড়া বাকি সব ধরনের কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ফলে কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ব্যয় কমবে এবং বাজারে এসব পণ্যের দামও কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তারা সরাসরি এর সুফল পেতে পারেন।
সিম ট্যাক্স পুরোপুরি বাতিল
বাজেটে মোবাইল গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো নতুন সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার প্রসার বাড়াতে এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই কর প্রত্যাহারের ফলে সরকারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব কমবে। তবে নতুন গ্রাহক বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্টার্টআপ খাতে দীর্ঘমেয়াদি ভ্যাট ছাড়
দেশের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের কর-সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী—
স্টার্টআপের স্থানীয় সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হবে।
বিদেশ থেকে সেবা আমদানির ক্ষেত্রেও ভ্যাট মওকুফ থাকবে।
অফিস বা কর্মস্থল ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভ্যাট দিতে হবে না।
এই সুবিধা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এটি দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য অন্যতম বড় নীতিগত সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল কনটেন্ট খাতকে উৎসাহ দিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের প্রদত্ত সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাজেটে শুধু আইটি ফ্রিল্যান্সিং নয়, অন্যান্য ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রেও কর-সুবিধা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখা লাখো ফ্রিল্যান্সার আরও উৎসাহিত হবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহ
ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন আমদানিতে বিশেষ কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এই খাতে- আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হবে। ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর পুরোপুরি তুলে দেওয়া হবে। এর ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো স্থাপন সহজ হবে।
স্থানীয় প্রযুক্তি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা
দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করতে সরকার কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে-
কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে কর-সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখা।
মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, সিসিটিভি, এটিএমসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে বিদ্যমান কর অব্যাহতি বাড়ানো। সেমিকন্ডাক্টর, চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যাপক শুল্ক-কর অব্যাহতি। স্মার্টকার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা।
টেলিকম খাতে কর কমানোর ইঙ্গিত
সরকার স্বীকার করেছে যে দেশে টেলিযোগাযোগ খাতে করের বোঝা এখনও অনেক বেশি। বর্তমানে টেলিকম খাতে কার্যকর করহার প্রায় ৫০ শতাংশ।
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, এই খাতের কর কাঠামো ধীরে ধীরে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারকে সেই প্রক্রিয়ার প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এমএএইচ














